-অমিতাভ নাথ
পূর্ববঙ্গ আজকের বাংলাদেশে মজহবি জিহাদের সূচনা হয় ১৩০৩ খ্রিষ্টাব্দের পর থেকেই। সেবছরেই দরবেশ তথাকথিত সুফি পীর শাহজালাল তার অনুচরদের নিয়ে শ্রী হট্টে আসেন। গৌড়ের সুলতান শামসুদ্দিন ফিরোজ শাহের প্রধান সেনাপতি নাসিরুদ্দিন তখন শ্রীহট্ট ও সংলগ্ন অঞ্চলের রাজা গৌরগোবিন্দের বিরুদ্ধে তৃতীয়বার অভিযান শুরু করলে শাহজালাল তার ৩৬০ জন অনুচর নিয়ে এই অভিযানে যোগ দেন। প্রচণ্ড যুদ্ধের পর রাজা গৌরগোবিন্দ পরাজিত হলে তার কৃতিত্ব বর্তায় শাহজালাল ও তার অনুচরদের উপর। কেননা পূর্বেও দু’বার ফিরোজবাহিনী শ্রীহট্ট আক্রমণ করলেও পরাজিত হয়েছিলো। যুদ্ধশেষে বিপুল সংখ্যক স্থানীয় হিন্দুকে ধর্মান্তরিত করা হয়। পূর্ববঙ্গে ইসলামের জিহাদি প্রচার ও প্রসারের এটিই প্রাথমিক ইতিহাস।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, শাহজালাল জিহাদে অংশ নিতেই ৭০০ সঙ্গী নিয়ে ভারতে এসেছিলেন ও তার গুরু নিজামুদ্দিন আঊলিয়ার নির্দেশেই রাজা গৌরগোবিন্দের বিরুদ্ধে অভিযানে যোগ দেন। মুক্তচিন্তাবিদ ও ‘ইসলাম ওয়াচ’ (ওয়েব সাইট) এর সম্পাদক এম. এ.খান তাঁর তথ্যসমৃদ্ধ গ্রন্থ ‘জিহাদঃ জবরদস্তিমূলক ধর্মান্তরকরণ, সাম্রাজ্যবাদ ও দাসত্বের উত্তরাধিকার-এ সুফিদের বাংলা তথা ভারতে ইসলাম প্রচারের ইতিহাস বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে তাদের হিন্দু ও বৌদ্ধদের ইসলাম ধর্মান্তরকরণ ছিল সহিংস ও রাজশক্রিয় হাত ধরেই (পৃষ্টা ১৩৯-১৫৬)।
এভাবে রাজা গৌরগোবিন্দের পতনের পর মুসলমান শাসকদের চেষ্টায় পূর্ববঙ্গে এক সময় জনবিন্যাসগত পরিবর্তন ঘটে। হিন্দুরা সেখানে সংখ্যালঘু হয়ে পড়লে তাদের ধর্মীয়, সামাজিক-সহ সর্বপ্রকার নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়। শেষে দ্বিজাতিতত্বের ভিক্তিতে দেশভাগের সময়ে তা’ চরম আকার নেয়। নোয়াখালিতে ১৯৪৬ –এ গণহারে হিন্দুদের ধর্মান্তরকরণ ও হত্যা, নারী ধর্ষণ যার জ্বলন্ত এক উদাহরণ। আজকের বাংলাদেশেও সেই জিহাদি ট্র্যাডিশন সমানে চলছে।
পূর্ববঙ্গ বাংলাদেশ হবার পর হিন্দুরা ভেবে ছিলেন তাদের আর জিহাদের বলি হতে হবে না। কিন্তু তারপরও নানা মিথ্যে কারণ খাড়া করে সময়ে সময়ে হিন্দু নিগ্রহ অব্যাহত ছিল। যেমন, ১৯৯০-৯২ সালে শ্রীরামজন্মভূমি আন্দোলন, যা ভারতের নিজেদের বিষয়, সেই আন্দোলনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের নামে উত্তাল বাংলাদেশে হিন্দুরা হন নির্যাতনের শিকার। প্রতিবছর দুর্গাপূজার সমর মূর্তিভাঙচুর বা ইসলাম অবমাননার অজুহাতে হিন্দু নিগ্রহ এক ধারাবহিক মজহবি জিহাদি কর্মকান্ড। ২০২৪ সালে সংরক্ষণ বিরোধী আন্দোলনেও ‘সফট টার্গেট’ হিন্দু-সহ সংখ্যালঘুরা। মেডিকেল ভিসার সাহায্যে ভারতে পালিয়ে আসা শাহবাগ আন্দোলনের পরিচিত মুখ বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য সমিতির নেতা বাপ্পাদিত্য বসু কলকাতায় এক সাংবাদিক সম্মেলনে জানান, ২০২৪ -এর জুলাই থেকে ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের উপর তিনহাজার অত্যাচারের ঘটনা ঘটেছে। গত দেড়বছরে কম করেও ২ লক্ষ হিন্দু প্রাণ ও ধর্ম বাঁচাতে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। এক তথ্য মতে, এই সময়ে জিহাদের বলি হয়েছেন ৪০০ সাংবাদিক। গ্রাস করা হয়েছে ১৬ লক্ষ একর হিন্দুদের জমি। ১০ লক্ষ একর দেবোত্তর সম্পত্তি হয়েছে বেদখল। আর আগুনে পুড়ে ছাই হয়েছে সংবাদপত্রের অফিস, জ্যান্ত মানুষ ও সাংস্কৃতিক সংস্থার কার্যালয়।
যে জিহাদের বীজ১৩০৩ খ্রিস্টাব্দে চারাগাছ ছিলো তা’ ধীরে ধীরে বিশাল বৃক্ষ হয়ে এখন বহুদূর পর্যন্ত নিজের শাখা প্রশাখা বিস্তার করেছে। জিহাদ, সন্ত্রাস ও সংস্কৃতি ধ্বংস —- মধ্যযুগীয় বর্বর মরুসংস্কৃতির এই তিন শৃঙ্খলে বাঁধা পড়েছে বাঙ্গালির সাধের বাংলাদেশ।
নির্বাচনের মাধ্যমে এখন সরকার গঠিত হলেও বৃষবৃক্ষের এই তিন শৃঙ্খল ভেঙে বাংলাদেশ যদি গণতন্ত্র, শান্তিও সমৃদ্ধির পথে হাঁটতে চায় তবে সেদেশের সংখ্যাগুরু শান্তিপ্রিয় মানুষদের নিজেদের ঐতিহ্য, পরম্পরা ও সংস্কৃতির শেকড় সন্ধান করতেই হবে। যেমন স্পেন, ইরান, আফ্রিকার মুসলিম দেশ টিউনিশিয়া বা তুরস্কের যুবপ্রজন্ম মধ্যযুগীয় বর্বর ধর্মীয় উগ্রতা ঝেড়ে ফেলে এখন শেকড়ের সন্ধান করছে। পাশাপাশি, মুক্তিযুদ্ধে হিন্দুদের পূর্ণ স্বীকৃতি ও তাদের আত্মত্যাগের সঠিক ইতিহাসকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরাও আবশ্যক।
সেই ইতিহাসের ভাষ্যমতে, পূর্ববঙ্গের স্বাধীনতার স্বপ্ন প্রথম দেখেছিলেন ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত। ১৯৪৮ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের সংসদে মাতৃভাষার দাবিতে সরব হয়েছিলেন তিনি। ১৯৭১ -এ ময়নামতী সেনা ছাউনিতে পাকিস্তানি সেনার হাতে অসহ্য নির্যাতনের পর তার মৃত্যু হয়। স্বাধীন বাংলাদেশ গঠনের প্রথম প্রস্তাবক ছিলেন স্বপন চৌধুরী। মুক্তিযুদ্ধের প্রথম বীরগতিপ্রাপ্ত মুক্তিযুদ্ধা হুতাত্মা জগজিৎ দাস। সে দেশের জাতীয় পতাকা ও জাতীয় প্রতীক ‘শালুক ফুল’-এর পরিকল্পনা করেছিলেন দু’জন হিন্দু। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে বৈদ্যনাথ তলায় হিন্দুদের সম্পত্তি শতাধিক বিঘার আমবাগানে গড়ে উঠেছিলো রাজধানী মুজিবনগর। সেদেশের জাতীয় সঙ্গীতের রচনাকার করিগুরু রবীন্দ্রনাথ। জাতীয় কবি মানবতাবাদী কাজী নজরুল ইসলাম।
সেই ইতিহাসই বলছে, মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে আশ্রয় নেওয়া ১ কোটি শরণার্থীর মধ্যে ১৫ লক্ষ ছিলেন হিন্দু। পাকিস্তানী খানসেনা ও জিহাদি রাজাকার বাহিনীর হাতে প্রাণ হারানো ৩০ লক্ষ নাগরিকের ২৫ লক্ষই হিন্দু। দু’লক্ষ ধর্ষিতা নারীর দেড় লক্ষ ছিলেন হিন্দু নারী। মুক্তিযুদ্ধ ও পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশকে সাহায্য করতে ভারত সরকারের তখন খরচ হয়েছিলো সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকা। যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছিলেন ২৬ হাজার ভারতীয় সেনা।
এসব আত্মত্যাগ ও অবদানের বিনিময়ে বাংলাদেশের হিন্দুদের ধারাবাহিক প্রাপ্য কি শুধুই উৎপীড়ন, ধর্ষণ ও ধর্মান্তরকরণ নয়তো দেশত্যাগ? বাংলাদেশে মজহবি জিহাদের সাতশো বছরের ইতিহাস সেই সাক্ষ্যই দিচ্ছে।


